রুহুল আমিন :: মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি খুব ঘটা করে সাংবাদিকদের অনুদান দিয়েছেন। ভাল কথা। এর আগেও আপনার নিজস্ব তহবিল থেকে বিভিন্ন পেশার দুস্থদের অনুদান দিয়েছেন। তখন এটা এই রকম ফলাও করে প্রচার হয়েছে কিনা জানি না! সাংবাদিকতায় আমার বয়স খুব কম। তাই এই ব্যাপারে আমি অজ্ঞ। কিন্তু এবার সাংবাদিকদের অনুদান দিয়েছেন যখন তা খুব ফলাও করে প্রচার এবং প্রকাশ হয়েছে। যদিও এই অনুদান দেওয়ার খবর প্রচার এবং প্রসারে সাংবাদিকরাই কাজ করেছে। তবে আমার লেখার প্রসঙ্গ এই খবরের প্রচার ও প্রসার নয়। মনে উদিত কোনোকিছু চাপা দিয়ে রাখতে নেই বলে এই কথাগুলো বলা।
সাংবাদিকদের কেনো অনুদান দিতে হবে? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে গত দেড় বছর কাজ করেছি। এর মধ্যে গত ছয় মাস বেতন পাইনি। তারপর আবার নতুন একটি অনলাইন পত্রিকায় কাজ শুরু করেছি। ছয় মাসের বেতন কোনোদিন পাবো কিনা তাও জানি না। আমার পরিচিত অনেক সিনিয়র সাংবাদিক যারা আছেন, তাদের অনেককেই আমাকে বলতে শুনি, বয়স কম ছেড়ে দাও এই পেশা। খুব অস্থির এবং জীবনযাপনের সর্বনিম্ন খরচ না আসা এই পেশা নিয়ে স্বপ্ন দেখো না।
গণমাধ্যম মালিকদের কাছ থেকে টাকা পায় না এমন সাংবাদিক খুব কম আছে বাংলাদেশে। আর আমার যেহেতু অনলাইন সাংবাদিকতা দিয়ে পেশাগত সাংবাদিকতা শুরু, তাই ব্যাপারটা আরো করুণ। ব্যাঙের ছাতার মতো অনলাইন নিউজ পোর্টালে ছেয়ে গেছে দেশ। কিন্তু পেশাদার সাংবাদিকতার চর্চা করে হাতে গোণা কয়েকটি। তার মধ্যে বেশিরভাগ সাংবাদিকের অবস্থাই খুব খারাপ। কারণ বেতন নিয়মিত হয় না। দোকান খোলার আগে যদি কর্মীদের বেতন দেওয়ার নিশ্চয়তা নেওয়ার অনুমতি লাগতো তবে এইরকম অবস্থা হতো না। বাজারে কর্মীর অভাব নাই। বেঁচে থাকার জন্য মানুষ হন্য হয়ে ঘুরছে এই শহরে। তাই কর্মী পেয়ে যায় মালিকরা। এরপর প্রথম কয়েকদিন বেতন দিয়ে শুরু হয় তালবাহনা। দেখা যায়, প্রতিটি নতুন পত্রিকাই কোনো না কোনো এজেন্ডা নিয়ে বাজারে আসে। যে সব এজেন্ডার বেশির ভাগই মালিকের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট। স্বার্থ শেষ হয়ে গেলে মালিকের আর কোনো দায় থাকে না। এভাবেই চলছে।
প্রধানমন্ত্রী, ঠিক এই সময়ে এসে আপনার অনুদান কাজ করে বেতন না পাওয়া একজন সাংবাদিকের কাছে সত্যিই হাস্যকর। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, অনুদান দিলেন? না দাদন দিলেন ভবিষ্যতের জন্য? সব হিসাব শেষে আপনি তো একজন রাজনীতিবিদই, তাই না? আর মিডিয়াগুলোর বেশির ভাগ মালিকই তো কোনো না কোনোভাবে রাজনীতির সাথে জড়িত। এদের কেউ কেউ তো আপনার দলের মনোনয়ন পেতে পত্রিকা হাউজ খুলেছে, টেলিভিশন এনেছে, কোটি টাকা দিয়ে কিনেছে মনোনয়ন। তারপর এমপি, মন্ত্রী! এই যখন অবস্থা তখন দাদন ছাড়া আমার কাছে আর কোনো অর্থ নাই এই অনুদানের।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমার বাবা একজন প্রান্তিক কৃষক। তার সর্বশেষ সম্বলটুকু দিয়ে বেসরকারি এক বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছর পড়াশোনা করে সাংবাদিকতায় একটা সার্টিফিকেট নিয়েছি। যদি অনুদান দিয়েই জীবন নির্বাহ করতে হয়, তবে কেনো এই বিষয়ে পড়াশোনার জন্য আপনাদের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন অনুমতি দিলো? যদি বাজারই না থাকে তবে কেন আমাদের তৈরি করা হলো? আমার বাবা যদি জানতে পারেন, এই পেশার মানুষরা দয়া-দক্ষিণার ওপর বেঁচে থাকে, তবে আত্মহত্যাই করবেন বোধ হয়। কারণ নিজের সর্বশেষটুকু দিয়েছেন শুধু একটু স্বচ্ছল হবেন বলে, পড়াশোনা শেষ করে একটি চাকরি করবো বলে। এই আশার পরে যদি জানেন যে, এই পেশার মানুষদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুদান দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়। তাহলে উনার জীবনের কোনো আশারই আর কোনো মূল্য থাকলো না।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, চার বছর পড়াশোনা করে ডিগ্রি অর্জন করে আপনার কাছে হাত পাততে পারবো না, আপনার দয়ার ওপর বেঁচে থাকতে পারবো না। কৃষকের ছেলে হতে পারি, কিন্তু দয়া ভিক্ষা নিয়ে বাঁচতে চাই না। আমার শ্রমের মূল্য পাবার নিশ্চয়তা চূড়ান্ত করে যেন মিডিয়া ব্যবসায় নামে মালিক, শুধু এইটুকুর নির্দেশ দিন মালিকদের। অনুদান চাই না, শ্রমের মূল্য চাই।
স্বীকারোক্তি: গাড়ি-বাড়িওয়ালাদের ‘উদ্দেশ্যপ্রণেদিত’ কিছু দিলে তা অনুদান হয় কিনা তা আমি বুঝিতে অক্ষম। এই অধম তাই সব ভুলে মেনে নিয়েছে যে, তেনারা (অনুদানপ্রাপ্ত সাংবাদিকরা) সত্যিই আর্থিক দিক দিয়া অক্ষম। এই অধমের চেয়েও অক্ষম।
লেখক : সাংবাদিক
উৎস লিংক

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন