রবিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

সনদ ছাড়া সাংবাদিকতা নয়



হায়দার আলী : প্রকৃত সাংবাদিকদের সুরক্ষা এবং অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধ করতে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। অপসাংবাদিকতা ঠেকাতে প্রেস কাউন্সিল ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে নানা পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। মূলত সাংবাদিকতার জন্য এক ধরনের নীতিমালা ঠিক করা হচ্ছে।
জানা গেছে, প্রেস কাউন্সিল থেকে এ বিষয়ে সুপারিশ আকারে একটি প্রতিবেদন পাঠানো হবে তথ্য মন্ত্রণালয়ে। এরপর যাচাই-বাছাই শেষে এর ভিত্তিতে আইন তৈরি করা হবে। প্রেস কাউন্সিল যেসব সুপারিশ করতে যাচ্ছে তার মধ্যে সাংবাদিকদের সনদ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকছে। এ ছাড়া প্রকাশিত কোনো সংবাদ বা লেখার কারণে মানহানির মামলা করতে হলে তা কেবল প্রেস কাউন্সিলে করার বিধানও রাখা হচ্ছে। প্রেস কাউন্সিল সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানা যায়, হলুদ সাংবাদিকতা ও ভুয়া সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে এবং প্রকৃত সাংবাদিকরা যাতে হয়রানির শিকার না হন তা নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগ হাতে নিয়েছে প্রেস কাউন্সিল।
প্রেস কাউন্সিল সূত্রে জানা যায়, সাংবাদিকদের সনদ নেওয়ার পরীক্ষার কাঠামো ও বিষয়বস্তু নিয়েও প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হচ্ছে। এতে বলা হচ্ছে, যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতা বিষয়ে পড়াশোনা করে সাংবাদিকতা পেশায় আসতে চাইবেন তাঁদের ক্ষেত্রে শুধু মৌখিক পরীক্ষা নিয়েই সনদ দেওয়া হবে। অন্যদিকে মূলধারার সংবাদমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে পত্রিকা কিংবা টেলিভিশনের সম্পাদক তাঁদের অধীনে থাকা সাংবাদিকদের তালিকা প্রেস কাউন্সিলে পাঠালে সনদ ইস্যু করা হবে। কিন্তু নতুন করে সাংবাদিকতা শুরু করতে চাইলে সনদ নিতে হবে।
জানা গেছে, পেশাগত কারণে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মানহানি মামলার বিষয়টি নিয়েও সুপারিশ করা হচ্ছে। দেশের সব পর্যায়ের মানুষের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা আদালতে হলেও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কেউ মানহানির মামলা করতে চাইলে তা যেন কেবল প্রেস কাউন্সিলেই করার বিধান করা হয় সে বিষয়ে সুপারিশ করা হচ্ছে।

প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বিচারপতি মমতাজ উদ্দিন আহমেদ এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর সঙ্গে কথা বলেছেন। 

তাঁকে একটি প্রস্তাব তৈরি করার জন্য বলা হয়েছে এবং সে অনুযায়ী প্রেস কাউন্সিল প্রতিবেদন তৈরি করছে। প্রেস কাউন্সিলের সভায় অনুমোদিত হওয়ার পর সুপারিশসহ প্রতিবেদনটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
অপসাংবাদিকতা বন্ধ করতেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বিচারপতি মমতাজ উদ্দিন আহমেদ। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন,
‘সনদ ছাড়া আগামীতে কেউ সাংবাদিকতা করতে পারবে না। সাংবাদিকতা করতে হলে অবশ্যই সনদ লাগবে। আর এই সনদের দাবিটি সরকারের নয়, বরং প্রকৃত সাংবাদিকরাই তুলছেন। অপসাংবাদিকতার কারণে প্রকৃত সাংবাদিকরা এখন চরম উদ্বিগ্ন। তাঁরা চান অপসাংবাদিকতা বন্ধে সনদের ব্যবস্থা করতে। তাই প্রকৃত সাংবাদিকদের প্রেস কাউন্সিলে তালিকাভুক্ত করা এবং পরীক্ষার মাধ্যমে সনদ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
সাংবাদিকতা করতে হলে কী ধরনের যোগ্যতা থাকতে হবে জানতে চাইলে প্রেস কাউন্সিলের সচিব শ্যামল চন্দ্র কর্মকার বলেন, ‘এখন এসব বিষয়ে বিভিন্ন স্থান থেকে মতামত নিয়ে সুপারিশ তৈরি করা হচ্ছে। প্রেস কাউন্সিলের সবার মতামত নেওয়া হবে। আলোচনার মাধ্যমে কী ধরনের সিদ্ধান্ত নিলে ত্রুটিমুক্তভাবে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা যায় সেটা নিয়ে আমরা কাজ করছি।’
‘সনদধারী সাংবাদিক চাই’ দাবি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ কয়েকটি লেখা লিখেছেন ব্লগার ও সাংবাদিক আরিফ জেবতিক। এ বিষয়ে সরকারের উদ্যোগ প্রসঙ্গে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেরিতে হলেও এমন একটি উদ্যোগ নেওয়ায় সরকারকে সাধুবাদ জানাতেই হচ্ছে। কারণ অপসাংবাদিকতার হাত থেকে প্রকৃত সাংবাদিকদের রক্ষা করতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই। সাংবাদিকতা একটি স্পর্শকাতর পেশা। যে কারো হাতে যেমন ছুরি-কাঁচি তুলে দিয়ে অপারেশনের সার্জন বানিয়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য হয় না, একইভাবে যে কারো হাতে কলম-ক্যামেরা-বুম তুলে দিয়ে তাকে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচারের দায়িত্ব দেওয়াটাও গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত নয়। এবার হয়তো পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্য ব্যক্তিরা এ পেশায় আসবেন বলে আশা করছি।’
প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের মহাপরিচালক শাহ আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন,
‘সাংবাদিক পরিচয়ে প্রতারণা পুরো সাংবাদিক সমাজের জন্য সম্মানহানিকর। তবে সাংবাদিকদের সনদের আওতায় আনার পরিকল্পনা আমাদেরও আছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল সনদ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে, সেই মতে তারা কাজও শুরু করেছে। আমরাও এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছি। যারা সাংবাদিকতা পেশায় আসতে চাইবে তাদের জন্য পরীক্ষা কিংবা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সনদের ব্যবস্থা করার চিন্তাভাবনা করছে সরকার। সনদ ছাড়া কেউ যেন সাংবাদিকতা পেশায় আসতে না পারে। আর এটা বাস্তবায়ন করা হলে হয়তো এ পেশায় অপসাংবাদিকতা অনেক কমে আসবে।’
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন,
‘অপসাংবাদিকতা বন্ধে সরকারের এ উদ্যোগ ইতিবাচক। এটা বাস্তবায়ন করা হলে অপসাংবাদিকতা অনেক কমে আসবে। যে কেউ ইচ্ছা করলেই এ পেশায় প্রবেশ করতে পারবে না। তবে এ আইন করার আগে গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনার দরকার আছে। সনদ দেওয়ার প্রক্রিয়া ও মাপকাঠি সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে। তাহলেই হয়তো উদ্যোগটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হবে।’
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গণমাধ্যমের পরিচয় দিয়ে ভয়াবহ প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে একটি চক্র। তারা পত্রিকায় খবর ছাপানোর ভয় দেখিয়ে মানুষকে প্রতারণা করে হাতিয়ে নিচ্ছে টাকা-পয়সা। অনেকে থানায় দালাল হিসেবে মধ্যস্থতা করে থাকে। দেখা গেছে, ঢাকাসহ প্রতিটি জেলা-উপজেলায় নামসর্বস্ব সাপ্তাহিক কিংবা পাক্ষিক পত্রিকায় কিছু একটা ছাপিয়েই কিছু লোক স্বঘোষিত সাংবাদিক হয়ে উঠছে। যেনতেন প্রকারে একটি পত্রিকা বের করে চলছে প্রতারণা আর চাঁদাবাজির উৎসব। এসব পত্রিকাকে বলা হয় আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকা। ঢাকা শহরে ‘সাংবাদিক’ স্টিকার লাগানো যত মাইক্রোবাস চলাচল করে, তার বেশির ভাগই আসলে রেন্ট-এ-কারের গাড়ি। এসবের সঙ্গে প্রকৃত সাংবাদিকদের কোনো সম্পর্কই নেই। এসব ভুয়া সাংবাদিকের দায় নিতে হচ্ছে প্রকৃত সাংবাদিকদের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাংবাদিক পরিচয়ধারী প্রতারক চক্র শুধু নামসর্বস্ব পত্রিকার পরিচয়পত্রই বহন করে না, তারা বিভিন্ন ঘটনাস্থলে গিয়ে মূলধারার পত্রিকার সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রতারণা করে থাকে। এ ছাড়া ভুঁইফোড় পত্রিকার অফিসগুলো মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে সাংবাদিকের পরিচয়পত্র বিক্রি করছে। এসব পরিচয়পত্র পকেটে রেখে এবং প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেলের সামনে ‘প্রেস’ স্টিকার লাগিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে কিছু মানুষ।
ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনসের ডিসি মাসুদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাংবাদিক না হয়েও অনেকে যানবাহনে প্রেস স্টিকার ব্যবহার করে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে নানা ধরনের অপরাধ করছে। রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক হোটেল থেকে শুরু করে ফুটপাত থেকে চাঁদাবাজি করছে সাংবাদিক নামধারী কিছু সিন্ডিকেট।’
ডিএমপির তেজগাঁও অঞ্চলের পুলিশের উপকশিনার (ডিসি) বিপ্লব কুমার রায় বলেন, ‘ভুয়া ও অখ্যাত পত্রিকার সাংবাদিক পরিচয়ে অনেকেই নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। প্রকৃত সাংবাদিকদের চেয়ে বেশি তদবিরের জন্য আসে ভুয়া ও অখ্যাত পত্রিকার সাংবাদিকরা। এতে মূলধারার সাংবাদিকদের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে।’

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, সাংবাদিক পরিচয়ধারী প্রতারকদের নানা অপতৎপরতার কারণে পুলিশ অনেক সময় বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে। থানায় অপরাধীদের হয়ে নানা তদবির করাই তাদের কাজ। তারা ভুয়া সাংবাদিক পরিচয়পত্র গলায় ঝুলিয়ে এবং গাড়িতে প্রেস স্টিকার লাগিয়ে মাদক পাচার করে এবং ককটেল-বোমা বহন করে রাজনৈতিক সহিংসতা চালিয়ে থাকে।

News Source

আরও খবর

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, অনুদান চাই না, শ্রমের মূল্য চাই

২০১৪ সালে অনুদান পাওয়া দুস্থ সাংবাদিকদের নামের তালিকা

সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি শুরু

 

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন